মোটরসাইকেলের সিট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মোটরসাইকেলের সিট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

নিজের মোটরসাইকেল চালানোর মত আনন্দ আর কিছুতে নেই। মোটরসাইকেলের দাম ২০২২ সালে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ ঠিকই নতুন বাইক কিনছেন। অথবা ব্যবহৃত বাইক কিনে সেটাকে নিজের মনের মত মডিফাই করিয়ে নিচ্ছেন। বলতে পারেন, বাইকের কোন জিনিসটা কাস্টমাইজ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি? উত্তর হচ্ছে মোটরসাইকেলের সিট

দেশের প্রায় ৭০% বাইকার লম্বা সময় ধরে বাইক চালানোর পর পিঠ, কোমর এবং হিপের ব্যথা নিয়ে অভিযোগ করেন। এর পিছনে প্রধাণ কারণ হচ্ছে মোটরসাইকেলের সিট ভালো না হওয়ায়, অথবা সিট হাইট বেশি হওয়ায় মেরুদণ্ড, কক্সিক্স এবং হিপ জয়েন্টে অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ পড়া। আপনি যত দামী কিংবা ভালো ব্র্যান্ডের বাইকই চালান না কেনো, সেই বাইকের সিটের উচ্চতা আর গড়ন যদি আপনার শরীরের গঠন ও আকৃতির সাথে সামঞ্জস্য না হয়, তাহলে সেই বাইকের রাইড কখনওই আপনাকে পরিপূর্ণ আরাম দিতে পারবে না।

চিন্তা নেই; আপনার রাইড সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা ভালোভাবে বোঝা এবং সব কিছুর সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য ‘বাইকস গাইড’ রয়েছে আপনার হাতের মুঠোয়। আমাদের আজকের বাইকস গাইড প্রতিবেদনে রয়েছে সেরা মোটরসাইকেলের সিট বেছে নেয়ার জন্য সব রকম প্রয়োজনীয় টিপস এবং বাইকের সিটের উচ্চতা কীভাবে আপনার রাইডের উপর প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বিস্তারিত।

মোটরসাইকেলের জন্য উপযুক্ত সিট যেভাবে চিনবেন

আপনার বাইক মডিফাই করানোর সময় সিট কুশন পছন্দ করতে এবং বাইকের সিট মডিফাই করার সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখার চেষ্টা করবেন।

বাইকের ধরণ অনুযায়ী মোটরসাইকেলের সিট নির্বাচন

আপনার বাইকটি কী ধরণের সেই অনুযায়ী মোটরসাইকেলের সিটের আকৃতি ও গঠন অনেকাংশে নির্ভরশীল। কেননা সিট কুশন ডিজাইন করার সময় বাইকের সিটের উচ্চতা ঠিক আছে কি না, সিটের গঠন কেমন, বসার পজিশন কেমন ইত্যাদি সবকিছু হিসাব নিকাশ করতে হয়। তা না হলে ঐ সিটে বসে কখনোই আরাম পাওয়া যাবে না।

উদাহরণস্বরূপ আপনার বাইক যদি কোনো স্পোর্ট ট্যুরিং, বা ডুয়াল স্পোর্ট, এমনকি যদি একটি ছোট ক্রুজার বাইকও চালান, তাহলে বেশিরভাগ মডেলের তুলনায় আপনার মোটরসাইকেলের সিট সরু এবং ছোট আকৃতির হবে। আর সেজন্য আপনার সিট কুশনটি ঐ বাইক সিটের মাপের সাথে মিলিয়ে বাছাই করতে হবে।

একই সাথে ঐ কুশনে যথেষ্ট পরিমাণে পুরু প্যাডিং এবং সুরক্ষাও থাকতে হবে। তবেই আপনি রাইড করার সময় মোটরসাইকেলের সিট এবং কুশন মিলে বেশিরভাগ ঝাঁকুনি শোষণ করবে। আর পুরোটা শোষণ করতে না পারলেও সমস্ত সিটের প্যাডিং-এ সমানভাবে ধাক্কাটা ছড়িয়ে পড়বে, আর আপনার শরীরকে বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবে।

মোটরসাইকেলের সিট কেমন উপাদান দিয়ে তৈরি সেদিকে নজর দিন

আপনার জন্য উপযুক্ত সিটটি খুঁজে পাওয়ার জন্য সেটি কোন ধরণের উপাদান দিয়ে তৈরি এটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনার মূল্যবান সময় শুধুমাত্র এমন মোটরসাইকেলের সিট কুশনের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত, যেখানে বিভিন্ন ধরণের উপাদানের অপশন থেকে বেছে নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

নিওপ্রিন রাবারের তৈরি কুশন আপনার মোটরসাইকেলের সিটকে আরামদায়ক ও সুরক্ষামূলক আকৃতি দিতে সক্ষম। কেননা এই উপাদানটি খুব সহজেই আপনার শরীরের মাপ এবং সিটের আকৃতি অনুযায়ী নিজের আকার সমন্বয় করে নিতে পারে। তাছাড়াও এটি সঠিক জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণে সুরক্ষা দিতে পারে।

এছাড়াও নিওপ্রিন পানিরোধী হওয়ায় বৃষ্টিতে বাইক চালানোর পরও আপনার কুশনটির কোনো ক্ষতি হবে না এবং পাথুরে রাস্তার বেশিরভাগ ধাক্কা বা শক শোষণ করে নেয়। 

আবার, যারা কিছুটা দৃঢ় অথচ হালকা ওজনের সিট কুশন চাচ্ছেন, তাদের জন্য পলিইউরেথিন এবং জেল, এই দুই ধরণের উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত কুশন সবচেয়ে ভালো হবে। মোটকথা কুশন কেনার আগে সেটার উপাদান এবং মান সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে।

শারীরিক কাঠামোর সাথে মিলিয়ে মোটরসাইকেলের সিট বানান

আমাদের দেশের প্রায় অনেক রাইডাররাই মনে করেন, যতক্ষণ মোটরসাইকেলের সিটের কুশন ভালো আর পুরু  আছে, ততক্ষন পর্যন্ত ব্যথার হাত থেকে তারা নিরাপদ। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, সঠিক সিট কুশন শুধুমাত্র প্যাডিং এর পরিমাণ দিয়ে বোঝা সম্ভব না।

বরং একটি মোটরসাইকেলের সিটের নিজস্ব গঠনশৈলী এবং সমানভাবে চাপ  বন্টন করার ক্ষমতা থাকা অত্যাবশ্যক। কিছু কিছু কোম্পানি বা মেকানিক আছেন, যারা বাইকারের শরীরের আকার অনুযায়ী সিট কুশনের প্যাডিং বসাতে পারেন।

এমন একটি মোটরসাইকেলের সিট বেছে নিন, যেটাতে প্যাডিং কুশন যোগ করার জন্য বেশ কয়টি ভিন্ন ভিন্ন পকেট রয়েছে। শরীরের মাপের সাথে মিল রেখে সিট না বানালে পরে আপনার পিঠ, কোমর এবং হিপ জয়েন্টে ব্যাপক ব্যথা, এমনকি মেরুদন্ডের গুরুতর কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

বাইকের সিটের উচ্চতা কি আপনার সাথে মেলে

মোটরসাইকেলের সিট পছন্দ করার ব্যাপারে এই বিষয়টা অনেকে তেমন একটা খেয়াল করে না, আবার অনেকে এই ব্যাপারে তেমন কিছু জানেনও না। কিন্তু অভিজ্ঞ একজন বাইকারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন। তিনি ঠিকই বলবেন যে সিট হাইট মাত্র এক ইঞ্চি হেরফের হলেও রাইডে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বাইক কেনার সময় আমরা বাইকটির ডিজাইন, মাইলেজ, ফিচার, পারফরম্যান্স, সিটিং পজিশন এই সবকিছু দেখেই পছন্দ করি। কিন্তু বাইকের সিটের উচ্চতায় হেরফের হয়ে গেলে, আপনার এত সাধের মোটরসাইকেল অস্বস্তিকর পজিশনে বসে চালিয়ে পুরো আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। আর এজন্যই কেনার আগে মোটরসাইকেলে চড়া অবস্থায়  বাইকের সিটের উচ্চতা ভালোভাবে চেক করে নিতে হবে।

সাধারণত বাইকে চড়ে বসার পর পা যেন সহজে মাটি ছুঁতে পারে, এতটুকু সিট হাইট যেন থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণভাবে সিট হাইট রাইডারের পা এর চেয়ে সর্বোচ্চ ০.২৫ইঞ্চি উঁচু হতে পারে, কখনও এর বেশি না। 

বাইকের সিটের উচ্চতা নিয়ে সমস্যা এবং মোটরসাইকেলের সিট হাইট সংক্রান্ত টিপস

ব্যবহারের উপর নির্ভর করে মোটরসাইকেলের সিট হাইট খুব সতর্কভাবে প্ল্যান করতে হবে। মোটরবাইকে লং ট্যুর দেয়ার ক্ষেত্রে এই বাইকের সিটের উচ্চতার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের আজকের বাইকস গাইডে আমরা এই সিট হাইটের গুরুত্ব নিয়ে কিছু হালকা ধারণা দিয়েছি। একটু নিচেই আমরা সিট বাছাই করার ব্যাপারে এমন কিছু  জরুরি টিপস জানবো, যেগুলো আমাদেরকে সঠিক সিট বাছাই করার সময় করণীয়।

মোটরসাইকেলের সিট হাইট কী?

সাধারণত মোটরসাইকেলের সিট হাইট মাপা হয় ইঞ্চিতে।  কিন্তু রাইডারদের এটা মনে রাখা আবশ্যক, যে এই হাইট সামান্য কয়েক মিলিমিটার কম বেশি হলেও আপনার রাইডে সমস্যা তৈরি হবে।

সিট হাইট মাপা হয় মাটি থেকে শুরু করে খাড়া দাঁড় করিয়ে রাখা মোটরসাইকেলের সিটের সবচেয়ে নিচু অংশ পর্যন্ত। তবে বাইক চালানো অবস্থায় পিলিওন সহ রাইডারের মোট ওজন এবং সাসপেনশনের সেটিংসের উপর নির্ভর করে এই বাইকের সিটের উচ্চতা কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

বাইকের সিটের উচ্চতা বেশি থাকলে কীভাবে ঠিক করব?

যেসব মোটরবাইক রাইডাররা উচ্চতায় একটু পিছিয়ে এবং পছন্দের মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে পা মাটিতে রাখতে অসুবিধায় পড়েন, তাদের কষ্টটা বাইকস গাইড একটু হলেও বোঝে। যেহেতু আমরা সিট হাইট নিয়ে কথা বলছি এবং রাইডিং-এর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে জেনেছি, তাই আজকের বাইকস গাইডে আমরা আমাদের পিছিয়ে পড়া ভাইদের রাইড আরেকটু সুন্দর করার জন্য কিছু উপকারী টিপস শেয়ার করতে চাই।

  • একজন রাইডারের জুতা নিরাপদ রাইডের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যাদের বাইকে বসা অবস্থায় মাটিতে পা রাখতে সমস্যা হচ্ছে, তারা কিছুটা উঁচু সোল-বিশিষ্ট বুট জুতা পরিধান করে রাইডটা আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যের করতে পারেন। 
  • মোটরসাইকেল চালনার সময় থামার প্রয়োজন হলে, যেদিকে পা নামাবেন সেদিকে সামান্য কাঁত হয়ে নিলে মাটিতে পা রেখে নিরাপদে ব্রেক করা সহজ হবে।
  • একজন নিয়মিত রাইডার এটা জানেন যে বাইক চালানোর সময় অল্প সময়ের জন্য থামতে হলে (যেমন- ট্র্যাফিক জ্যামের সময়) আপনি যেকোনো একটি পা-ই মাটিতে রাখতে পারবেন। এক্ষেত্রে ফুটপাথ কিংবা অসমতল রাস্তার ক্ষেত্রে যেকোনো উঁচু জায়গায় পা রেখে দাড়ানোর চেষ্টা করুন।

শেষকথা

মোটরসাইকেলের সিট হাইট আসলে অনেকগুলো জিনিসের উপর নির্ভর করে। দিনশেষে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে আপনি আপনার বাইকটি চালানোর সময় কতটুকু নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। বাইকের সিটের উচ্চতা যেমনই হোক না কেনো, চালানোর সময় কিন্তু বাইকের ওজনটাও আপনার স্বাচ্ছন্দ্য এবং সিটিং পজিশনের উপর অনেক বড় প্রভাব ফেলে।

হালকা ওজনের বাইকগুলো চালানোর সময় পা কোনোরকম মাটিতে ছোঁয়ালেই কাজ হয়ে যায়, কিন্তু অতিরিক্ত ভারী বাইক ব্যালেন্স করার জন্য আপনাকে শরীরের শক্তি দিয়ে দুই পা ব্যবহার করতে হয়। তাই বাইক মডিফাই কিংবা কেনার সময় টেস্ট রান নিতে ভুলবেন না যেন। সিট হাইট যেন আপনার স্বাছন্দ্য আর সুখের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেই আশাই করছে বাইকস গাইড। হ্যাপী রাইডিং!

Similar Advices



Leave a comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.