মোটরসাইকেল ব্রেক নিয়ে যত সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান

মোটরসাইকেল ব্রেক নিয়ে যত সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান

যেকোনো বাইকের জন্য ব্রেক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অটো পার্টস। আর একটি মোটরসাইকেল ব্রেক সব সময় একই অবস্থায় থাকে না; এর গুনগত মান, বৈশিষ্ট্য এবং কর্মদক্ষতা সময়ের সাথে পরিবর্তন হতে থাকে এবং একটা সময় সেটা পরিবর্তন করতে হয়। তাপমাত্রা, রাইডের ধরণ, কতক্ষণ ধরে চালানো হচ্ছে, এবং পরস্পর সংযুক্ত বিভিন্ন অটো পার্টসের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সবকিছুই একটা মোটরসাইকেল ব্রেকের উপর প্রভাব ফেলে।

সার্ভিসিং করানোর সময় মেকানিক বা ইঞ্জিনিয়ারের দুই একটা কথা শুনেই আমরা চট করে ব্রেক বা লাইনার বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। মোটরসাইকেলের দামের মত ব্রেক বা লাইনারের দামও কিন্তু কম না। অথচ মোটরসাইকেল ব্রেক নিয়ে এমন কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো হয়ত অল্প কিছু জিনিস এদিক সেদিক করে বা মেরামত করেও সমাধান করা যায়। চলুন দেখে নিই মোটরসাইকেল ব্রেক কম কাজ করার কারণ, কিছু বেসিক সমস্যা, সেগুলোর কারণ ও সমাধান।

মোটরসাইকেল ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

১. মোটরসাইকেল ব্রেক ফেইড

কখনও কখনও এমন হয় যে মোটরসাইকেল ব্রেক লম্বা সময় ধরে ব্যবহার করার পর একটা সময় চাকা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়; এই ঘটনাকে বলা হয় ব্রেক ফেইড। ব্রেকের কর্মদক্ষতা তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে পরিবর্তন হয়। দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তাই মোটরসাইকেল ব্রেকের ঘর্ষণ প্রতিক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে।

ব্রেক ফেইডঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • বারবার তীব্রভাবে মোটরসাইকেল ব্রেক কষা হলে, তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে ব্রেক ড্রামগুলো প্রসারিত হয়, অথবা ব্রেক লাইনিং-এর ঘর্ষণ প্রতিক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, অথবা দু’টোই একসাথে ঘটে। এক্ষেত্রে ব্রেক ফেইড হতে পারে।

সমাধানঃ 

এরকম ঘটলে মোটরসাইকেলের স্পিড/ লোড কমিয়ে এনে কম গিয়ারে চালাতে হবে। ব্রেক লাইনিং বা ড্রাম কিছুটা ঠান্ডা হয়ে আসলেই ব্রেক ফেইড পুরোপুরি চলে যাবে এবং মোটরসাইকেল ব্রেকের কর্মদক্ষতা আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

  • ব্রেক ফ্লুইড বেশি পুরনো হয়ে গেলেও একই সমস্যা হতে পারে।

সমাধানঃ

নিয়মিত মোটরসাইকেলের যত্ন নেয়া। পুরনো ফ্লুইড ফেলে দিয়ে সঠিক স্পেসিফিকেশনের নতুন ফ্লুইড যোগ করা।

  • ব্রেক লাইনিং এবং ড্রামের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন অথবা অবনতি হলেও ব্রেক ফেইড হতে পারে।

সমাধানঃ 

ব্রেক শ্যু-গুলোকে জায়গামত বসিয়ে এবং/অথবা ঘষে সঠিক ব্যাসে নিয়ে আসতে হবে। 

  • আমাদের মধ্যে অনেকেরই ব্রেক প্যাডেলের উপর পা দিয়ে বাইক চালানোর বদঅভ্যাস থাকে। এর ফলে ব্রেকের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং খুব দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে ব্রেক ফেইড হয়।

সমাধানঃ 

কখনওই ব্রেক প্যাডেলের উপর পা রেখে বাইক চালানো যাবে না। এমনকি প্রয়োজন ছাড়া ব্রেক লিভারও চেপে ধরে রাখা যাবে না।

২. মোটরসাইকেল ব্রেক বাইন্ডিং

কিছু পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেল ব্রেক ড্রামের সাথে ব্রেক লাইনার এমনভাবে আটকে যায়, যে ব্রেক লিভার বা প্যাডেলে চাপ না দেয়া সত্ত্বেও পুরোটা সময় ব্রেক সচল থাকে। এই ঘটনাকে বলা হয় ব্রেক বাইন্ডিং অথবা ড্র্যাগিং।

ব্রেক বাইন্ডিংঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ স্প্রিং-এর কারণে ব্রেক বাইন্ডিং হয়। মোটরসাইকেল ব্রেক শ্যু অথবা প্যাডেলকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য যেই স্প্রিং, সেটা মাঝে মাঝে দুর্বল হয়ে যায় বা ভেংগে যায়। 

সমাধানঃ 

এরকম ঘটলে স্প্রিং পরিবর্তনই একমাত্র সমাধান।

  • অ্যাংকর পিনের উপর ব্রেক শ্যু কোনওভাবে আটকে গেলেও একই সমস্যা হতে পারে।

সমাধানঃ

অ্যাংকর পিনে ভালোভাবে লুব্রিকেশন ব্যবহার করা হলে ব্রেক বাইন্ডিং ঠেকানো সম্ভব।

  • ডিস্ক ব্রেকের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্রেক ফ্লুইডের ট্যাংকে অতিরিক্ত ফ্লুইড থাকলেও ব্রেক বাইন্ডিং হতে পারে।

সমাধানঃ

মোটরসাইকেলের যত্ন নেয়ার সময় ব্রেক ফ্লুইডের পরিমাণ সংশোধন করা ও সঠিক পরিমাণে রাখা উচিত।

৩. মোটরসাইকেল ব্রেক অতিরিক্ত গরম হওয়া

ব্রেক বাইন্ডিং যেসব কারণে হয়, সেই একই কারণে মোটরসাইকেলের ব্রেক অতিরিক্ত গরমও হতে পারে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা থেকে ঘর্ষণ প্রতিক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং বাইন্ডিং বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত গরমঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • উপরে উল্লেখিত বিভিন্ন কারণ ছাড়াও, অনেক ক্ষেত্রে ঢালু রাস্তা দিয়ে নামার সময় মোটরসাইকেল ব্রেক লম্বা সময় ধরে চেপে রাখা হলে অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। ডিস্ক ব্রেকের ক্ষেত্রে, উপরের কারণ ছাড়াও ক্যালিপারের ভেতর পিস্টন আটকে যেতে পারে।

সমাধানঃ 

এরকম ঘটলে ক্যালিপারটি রিবোর করতে হবে এবং পিস্টন বদলে ফেলতে হবে।

৪. সশব্দে মোটরসাইকেল ব্রেক কাঁপা

এই পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেল ব্রেক থেকে একটানা শব্দ ও কাঁপুনি অনুভব হয়।

টানা শব্দ ও কাঁপুনিঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • মোটরসাইকেল ব্রেকের সমন্বয় ঠিকভাবে না করা হলে এই সমস্যা হতে পারে। আবার, ব্রেক লাইনিং-এর সংযোগগুলো ঢিলা হয়ে গেলেও সশব্দ কাঁপুনি হতে পারে।

সমাধানঃ 

এরকম কাঁপুনি ও শব্দ আসতে থাকলে মোটরসাইকেল ব্রেকের সমন্বয় ঠিকভাবে করাতে হবে। ব্রেক লাইনিং নতুন করে সংযোগ দিতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাইনিং-টাই বদলে ফেলতে হয়।

৫. মোটরসাইকেল ব্রেক আটকে যাওয়া/গ্র্যাবিং

মোটরসাইকেল ব্রেক একই অবস্থানে আটকে গেলে বা আটকে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিলে সেটাকে ব্রেক গ্র্যাবিং বলে।

ব্রেক গ্র্যাবিংঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • ড্রাম ব্রেকের ক্ষেত্রে প্রায়শই তেল চিটচিটে লাইনিং-এর কারণে মোটরসাইকেল ব্রেক আটকে যেতে পারে। মাঝে মাঝে মেকানিকরা ব্রেক লাইনিং ভালোভাবে পরিষ্কার না করেই ব্রেকের সাথে সেগুলো জুড়ে দেয়। ফলে কিছুদিন ব্যবহার করার পরই মোটরসাইকেল ব্রেক আটকে যেতে পারে।

সমাধানঃ 

মোটরসাইকেলের যত্ন নেয়ার সময় ব্রেক লাইনিং ভালোভাবে পরিষ্কার করান।

  • ব্রেক শ্যু-এর সমন্বয়ে ভুল থাকলে ব্রেক গ্র্যাবিং হতে পারে। এমনকি এই সমন্বয়ের সময় ভেতরে ধুলা-ময়লা চলে গেলেও একই সমস্যা হতে পারে।

সমাধানঃ

নতুন করে ব্রেক শ্যু সমন্বয় করতে হবে এবং পরিষ্কার করতে হবে।

  • ব্রেক ড্রাম ঘর্ষণের কারণে এবড়ো থেবড়ো হলেও ব্রেক গ্র্যাবিং হতে পারে।

সমাধানঃ 

ব্রেক ড্রাম ঘষে সঠিক মাপে নিয়ে আসতে হবে। 

  • কখনও যদি ভুলবশত মোটরসাইকেলের ব্রেক শ্যু-গুলো ভুল জায়গায় বসানো হয়, তাহলেও ব্রেক গ্র্যাবিং হয়। মোটরসাইকেলের যত্ন নেয়ার সময় প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শ্যু এর জায়গা অদল বদল হয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

সমাধানঃ 

মোটরসাইকেলের ব্রেক শ্যু-গুলো নিজ নিজ জায়গায় ঠিকভাবে ইনস্টল করা হলে গ্র্যাবিং চলে যাবে।

৬. মোটরসাইকেল ব্রেক ফ্লুইড অতিরিক্ত কমে যাওয়া

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, যে ডিস্ক ব্রেক সিস্টেম থেকে ব্রেক অয়েল লীক করলে এই সমস্যা হতে পারে। মোটরসাইকেল ব্রেকের বিভিন্ন সংযোগস্থল বা জয়েন্ট থেকে, বেনজো বোল্ট, ক্যালিপার সাইড, প্লাঞ্জার বিন্যাস, কিংবা অয়েল ট্যাংক থেকেও এই রেক ফ্লুইড লীক হতে পারে। অতিরিক্ত ব্রেক ফ্লুইড বেরিয়ে যাওয়াও মোটরসাইকেল ব্রেক কম কাজ করার কারণ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ক্ষয়ক্ষতির জন্য মেইন্টেনেন্সের খরচ অনেক বেশি বেড়ে যাবে।

ব্রেক ফ্লুইডের অভাবঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • ব্রেক অয়েলের ট্যাংক এবং ক্যালিপার থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ফ্লুইড লীক হয়।

সমাধানঃ 

মোটরসাইকেলের যত্ন নেয়ার সময় এই অংশগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে এবং প্রয়োজনমাফিক সেগুলো মেরামত অথবা পরিবর্তন করতে হবে।

  • বিভিন্ন জয়েন্টের সংযোগ ঢিলা থাকলে, সেইসব জয়েন্ট থেকে প্রায়ই অনেক ব্রেক ফ্লুইড বেরিয়ে যেতে পারে।

সমাধানঃ

সংযোগের পাইপ কিংবা হোজগুলোতে কোনো ক্ষয় হয়েছে কি না তা কিছুদিন পরপর চেক করতে হবে। ব্রেক ফ্লুইড অতিরিক্ত কমে যাওয়া ঠেকানোর জন্য ক্ষয় হওয়া হোজগুলো যত দ্রুত সম্ভব বদলে ফেলতে হবে।

৭. ব্রেক লাইনে বাতাস ঢোকা

ডিস্ক ব্রেক সমন্বয়ের সময় সতর্কতার অভাবে এই সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমরা সকলেই জানি যে, ডিস্ক ব্রেকে এক ধরণের অসংকোচনশীল মোটরসাইকেল ব্রেক অয়েল ব্যবহার করা হয়, যা ব্রেক লিভার এবং ক্যালিপার পিস্টনকে পরস্পরের সাথে কাজ করার জন্য সংযোগ স্থাপন করে। সেজন্য এই অয়েলের ঘনত্ব উচ্চমাত্রার হওয়া আবশ্যক।

এখন ব্রেক লাইনে যদি ভুলক্রমে একটু বাতাসও ঢুকে পরে, তখনই ব্রেকের কার্যক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটে। কেননা বাতাস হচ্ছে সংকোচনশীল। ব্রেক করার সময় ফ্লুইডের চাপে বাতাসের বুদবুদ সংকুচিত হয়ে গিয়ে ব্রেকিং প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেয়।

ব্রেক লাইনে বাতাসঃ ব্রেক কম কাজ করার কারণ ও সমাধান

  • ব্রেক লাইনে বাতাস ঢোকার একমাত্র কারণ হচ্ছে কোথাও লীক থাকা। ফ্লুইড ট্যাংক কিংবা ক্যালিপারের কোথাও লীক সৃষ্টি হলে ব্রেকিং সিস্টেমে বাতাস ঢুকে যায়। কোনো সংযোগ ঢিলা থাকলে, সেখান থেকেও বাতাসের বুদবুদ তৈরি হতে পারে।

সমাধানঃ

পুরো ব্রেক লাইন এবং সবগুলো সংযোগ ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোথায় লীক হচ্ছে, এবং সেগুলো ভালোভাবে মেরামত বা পরিবর্তন করতে হবে। কোথাও কোন সংযোগ ঢিলা থাকতে দেয়া যাবে না। বাতাসের বুদবুদ বের করার সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম হচ্ছে সতর্কতার সাথে ব্রেক অয়েল ঝরানো; আর এই সুক্ষ্ম কাজটি একটি ভালো অটো পার্টসসার্ভিস স্টেশনে অভিজ্ঞ লোকের হাতে করানোই উত্তম।

শেষকথা

উপরে উল্লেখিত এই সমস্যাগুলোই মূলত মোটরসাইকেল ব্রেক কম কাজ করার কারণ। আশা করি আমাদের এই প্রতিবেদন আপনাকে সঠিক উপায়ে মোটরসাইকেলের যত্ন নিতে এবং নিরাপদ থাকতে সহায়তা করবে। এরপর যদি কখনও আপনার মোটরসাইকেল ব্রেক নিয়ে সমস্যা হয়, ঘাবড়াবেন না। ঠান্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আশা রাখি। হ্যাপী রাইডিং!

গ্রাহকদের নিয়মিত কিছু প্রশ্নের উত্তর

মোটরসাইকেলের ব্রেক ফেইল হয় কীভাবে?

লুব্রিকেশনের অভাবে ব্রেক অতিরিক্ত গরম হওয়া, ব্রেক বাইন্ডিং, গ্র্যাবিং, লীক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ব্রেক ফেইল হতে পারে। তবে সেটা ব্রেক ফেইল নাকি ফেইড এটা বোঝার জন্য প্রথমেই ঘাবড়ে না গিয়ে স্পিড ও গিয়ার কমিয়ে মোটরসাইকেল ব্রেক ড্রাম ও লাইনিং কে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ দিন।

বেশি জোরে হার্ড ব্রেক কষা হলে কী হতে পারে?

অনেক বেশি হার্ড ব্রেক করা হলে সামনের চাকা লক হয়ে বাইক ছিটকে যেতে পারে এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সাথে সাথে রেক লিভার ছেড়ে দিন। চালানোর সময়ও কখনো ব্রেক লিভার  বেশিক্ষণ চেপে ধরে রাখবেন না।

Similar Advices



Leave a comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.